মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১০

দুর্নীতি দমনে রাসুলের (সা.) শিক্ষা অধিক কার্যকরী

এ মুহুর্তে দুর্নীতি বাংলাদেশের এক বহুল আলোচিত (টক অব দ্য কান্ট্রি) বিষয়। যদিও সন্ত্রাসকে এক নম্বর আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ সন্ত্রাস অনেকটা সুবিধাবাদী বিশ্ব মিডিয়ার তৈরি। পৃথিবীর সবলরা বদমতলব হাসিল করার জন্য এবং নিজেদের বীভৎস স্বৈরতান্ত্রিক রুপ আড়াল করার জন্য মুলত কাগুজে সন্ত্রাসী তৈরি করেছে। সন্ত্রাসের হাম্বা-হাম্বা রব করে পৃথিবীকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করা হয়েছে, বাস্তবতা কিন্তু ততটা নয়। আমি মনে করি, পৃথিবীর মুল সমস্যা হলো দুর্নীতি। অবশ্য সন্ত্রাসও একটি দুর্নীতি বটে। গত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশ দুর্নীতির শীর্ষস্হান লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। যদিও পৃথিবীজুড়ে দেশে দেশে কমবেশি এর অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষস্হান লাভ করেছে, এটিও সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর উচ্ছিষ্টভোগী কিছু সুবিধাবাদীর মনগড়া তৈরি। বরং মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তনকারী দেশগুলোতে দুর্নীতি তার চেয়েও অনেক বেশি। সে হিসেবে বাংলাদেশের পরিবর্তে পাশ্চাত্যকেই পৃথিবীর শীর্ষস্হানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বললে ভালো হয়। কারণ সেখানকার বর্তমান নেতৃত্ব পৃথিবীর দেশে দেশে শুকনের মতো সম্পদ খুঁজে ফিরে এবং মিথ্যা আর চাতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করে অস্ত্রশক্তি বলে পৃথিবীর সম্পদ কুক্ষিগত করে চলেছে।

দুর্নীতি একটি নেতিবাচক শব্দ। সহজ ভাষায় বুঝি-কু-নীতি, কু-রীতি। আরবিতে যাকে ফাসাদ বা আল ইফরাদ বলা হয়। ব্যাপক পরিসরে বলতে অসদাচরণ, দুর্নীতি, রীতিনীতি ভালো নয় এমন, দুর্নীতিপরায়ণ, দুঃশীল, অশিষ্ট, দুষ্ট নীতি, খারাপ নীতি ইত্যাদি অনেক কিছু বলা হয়। এ দৃষ্টিতে সব ধরনের দুরাচারী, দুবৃêত্ত, পাপিষ্ঠ, কদাচারী, দুর্বচন, দুর্বাক, দুরুক্তি, দুর্মুখ, দুরভিসন্ধি, দুবৃêত্তায়ন, দুর্বিনীত, দুর্বুদ্ধি, দুর্বøবহার, দুশ্চরিত্র, দুষ্কর্ম ও দুষ্কর্মা-এরা সবাই দুর্নীতিবাজ। এর ইতিবাচক শব্দ হলো নীতি। নীতির আগে উপসর্গ লাগিয়ে একে সুনীতি বলার প্রয়োজন নেই। কারণ নীতি বলতে সুনীতি বা ভালো নীতিকেই বোঝায়। যেমন বলা হয়ে থাকে লোকটি নীতিবান। তার মানে লোকটি ভালো। বরং নীতির বিপরীতমুখী শব্দের কোনো স্বয়ংসম্পুর্ণতা নেই। নীতির সঙ্গে উপসর্গ লাগনো ছাড়া তার অস্তিত্ব বিলীন। তার মানে নীতির বিপরীত কোনো কিছুর অস্তিত্বই থাকবে না। দুর্নীতি একটি ফিতনা হিসেবে আল্লাহ তায়ালা এর অস্তিত্বের উপস্হিতির বিরুদ্ধে বলেছেনঃ ‘ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও যতক্ষণ ফিতনা দুরীভুত হয়।’ সুতরাং দুর্নীতি বা কুনীতির ‘দু’ ও ‘কু’ লাগিয়ে এর অস্তিত্বদানেরই প্রয়োজন নেই। কারণ পৃথিবীতে শুধু নীতিই বেঁচে থাকবে।

আমাদের দেশসহ দুনিয়া জুড়ে যারা দুর্নীতি দমনে আন্তরিকতার পরকাষ্ঠা প্রদর্শন করছেন, তারা শুধু নেতিবাচক দিকটি নিয়ে সামনে এগোন। ইতিবাচক দিক তথা ন্যায়নীতি বা সুনীতির প্রশ্নকে কখনো বিবেচনায় আনেন না। ন্যায়নীতি কী? সুনীতি কী? দুর্নীতি কী? ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্ন বাদ দিয়ে শুধু দুর্নীতি নিয়ে হইচই বাধালে সমাধানের পরিবর্তে অসংখ্য জটিল সমস্যার আবর্তে পড়ে হ-য-ব-র-ল অবস্হার সৃষ্টি হবে। আপাদমস্তক দুর্নীতির কঠিন রোগে আক্রান্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত সমাজের কোনো অংশে ওষুধ প্রয়োগ করা হলে তাতে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। বরং আরো জটিল রোগে পুনরায় মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতেই থাকবে। তখন এর প্রতিরোধ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং পা-কে ধুলিবালি বা কাদামুক্ত রাখার জন্য পৃথিবীর তামাম মাটিকে না ঢেকে নিজের পা ঢাকার ব্যবস্হা করার মতো উত্তম ও অধিকতর সহজ কাজের দিকে মন দেয়াই ভালো। দুর্নীতি সমস্যার সফল সমাধানের জন্য আপাতত দুর্নীতির আগে ন্যায়নীতির প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ সমাজ ব্যবস্হাকে ঢেলে সাজানোর নিমিত্তে সর্বপ্রথম ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার চিন্তা ও সর্বচেষ্টা নিয়োগ করতে হবে। এটিই ভালো পন্হা এবং এ পন্হায় দুর্নীতি দমন সম্ভব। রাসুলে আকরামের (সা,) পবিত্রতম জীবনচরিত থেকে আমরা সে শিক্ষাই পাই।

মহানবী (সা.) তৎকালীন অধঃপতিত সমাজকে দুর্নীতির গভীর খাদ থেকে উদ্ধারের নিমিত্তে এর ইতিবাচক দিক তথা ন্যায়নীতি বিকাশের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এজন্য সর্বপ্রথম তিনি মানুষের মন-মননে ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ জাগ্রত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এজন্য তিনি নেতিবাচক তথা উদ্ধতভাবা, খড়গহস্ত ও কর্কষভাষী হননি। বরং তাঁর মনের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে, একান্ত অকৃত্রিম হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে ও অত্যন্ত কোমলভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন। যার স্বীকৃতি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এভাবে দিয়েছেনঃ ‘আপনি যে কোমল হৃদয় হতে পেরেছেন, সে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহেরই ফল। কিন্তু আপনি যদি কঠিন হৃদয় ও কর্কশভাষী হতেন তাহলে তারা সবাই আপনাকে ছেড়ে চলে যেত।’ (সুরা ইমরানঃ ১৬) আল্লাহর পক্ষ থেকেও এ কৌশলই তাঁর প্রিয় বান্দাহকে অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘হে নবী, ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। মন্দকে ভালো পন্হায় প্রতিরোধ করো। তখন দেখবে, তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে।’ (সুরা হা-মীম আস সেজদাঃ ১৮) তাঁর প্রিয় রাসুলের (সা.) ওপর অবতীর্ণ প্রথম প্রথম আসমানি ফরমানগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ সংবলিত। রাসুলের (সা.) মক্কী জীবনের আয়াতগুলো তার বাস্তব প্রমাণ। এসব ফরমানের আলোকে তিনি বিশ্ববাসীকে প্রথমত নৈতিকতা ও মানবতার চতুর্সীমার মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন।

তিনি মানুষদের তাওহিদ, রেসালাত, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্হাপন এবং সমাজ কায়েমের আহ্বান জানাতেন। আল কোরআনে অঙ্কিত আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য উপস্হাপন করতেন। পাশাপাশি চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা, মিথ্যা বলা, রাহাজানি করা, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফেরানো প্রভৃতি কাজ থেকে বিরত রাখা ও তাদের মনে ঘৃণা জন্মানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আত্মার পবিত্রতা সাধন, মন-মানসে মলিনতা, শোষণ এবং জৈবিক ও পাশবিক পঙ্কিলতাগুলো প্রক্ষালন করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রথমেই তিনি তরবারির কাছে নয় বরং হেদায়াতের আলোর প্রয়োজনীয়তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হাত, পা ও মাথা নত করার আগে মানুষের মনের ব্যাকুলতার প্রয়োজনীয়তার অনুভব করেছেন। শারীরিক বশ্যতার আগে আত্মার আনুগত্যশীলতাকে উজ্জীবিত করেছেন। কারণ আল্লাহর ভয় যার মনকে বিচলিত করে না, মানুষের ভয় তাকে কীভাবে বিচলিত করবে?

আপাতত সারা পৃথিবী দুর্নীতিকে বৈষয়িকতার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে। কিন্তু নীতিবহির্ভুত সব ধরনের কাজকর্ম, আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তা সবই এর আওতাভুক্ত। যেহেতু আয়-উপার্জন জীবনের বিশাল অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এক্ষেত্রে দুর্নীতিকে বিশাল করে দেখা হচ্ছে। তবে ইসলামও আয়-উপার্জনকে কখনো নিরুৎসাহিত করেনি। বরং রাসুলের (সা.) অসংখ্য বাণীতে রুজি-রোজগারের ব্যাপারে উৎসাহদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি আয়-উপার্জনে উৎসাহদানের পাশাপাশি হালাল-হারামের সীমারেখাও জানিয়ে দিতেন। অর্থ-সম্পদের প্রতি মোহ শাশ্বত। কিন্তু অতিরিক্ত মোহ মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ‘ধনী হওয়া সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয় বরং প্রকৃত সম্পদশালী সেই যার অন্তর সম্পদশালী। অবৈধভাবে আহরিত সম্পদ অপবিত্র।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র জিনিস ছাড়া তিনি অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম) বৈধভাবে যতটুকু সম্পদ অর্জন করা হয়, ততটুকুতেই আল্লাহর অবারিত বরকত নিহিত থাকে। হারাম বা অবৈধভাবে আহরিত সম্পদে আল্লাহর বরকত থাকে না। যার ফলে দুর্নীতিবাজ অঢেল সম্পত্তিতেও তৃপ্তি লাভ করতে পারে না। বরং তার লোভের জিহ্বাটি লম্বা হতেই থাকে। ফলে ‘আরো সম্পদ চাই, আরো সম্পদ চাই’ করতে করতে এক সময় তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। পৃথিবীজুড়ে তার অসংখ্য নজির আমরা দেখতে পাই।

সুতরাং দুর্নীতিকে সমুলে উচ্ছেদ করে মানুষকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভুতিশীল, মানব-দরদি ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাসুলের (সা.) শিক্ষাকেই গ্রহণ করতে হবে। এজন্য রাসুলের দেখানো ইতিবাচক পথ ধরেই আমাদের এগোতে হবে। বিশেষভাবে অনুসরণীয় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুর্নীতি উচ্ছেদ করার জন্য আল্লাহর দেয়া প্রতিটি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের প্রতিও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ ইসলামের প্রতিটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত দুর্নীতি দমনে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালায়। যে সমাজে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে দুর্নীতির অস্তিত্ব থাকতেই পারে না। তবে এ কর্মসুচিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় দন্ড যাদের হাতে তাদের তথা সরকারের। আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘তাদেরকে যদি আমি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে, ভালো কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা হজঃ ৪১) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎ কাজের আদেশ করবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আর এরাই সফলকাম।’ (সুরা আল ইমরানঃ ১০৪) উল্লিখিত আয়াতে ‘নির্দেশ করার’ কথা বলা হয়েছে। নির্দেশ দেয়ার যোগ্যতা রাখে তারাই যারা ক্ষমতার দন্ড হাতে নিয়ে বসে আছে। আল্লাহ তায়ালা সারা পৃথিবীকে রাসুলের পথেই দুর্নীতি দমনের সুমতি দিন। আমীন।

*************************************************************


Categories

জা ফ র আ হ মা দ
আমার দেশ, ২১ মার্চ ২০০৮

1 টি মন্তব্য:

  1. হাদিসে আছে “হুব্বুল অতানে মিনাল ইমান”-দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ। মহানবী (সাঃ) নিজের জীবনের চেয়েও দেশকে ও দেশের মানুষকে বেশি ভালবাসতেন। আবার সাধারন মানুষও তাঁকে প্রাণ ভরে ভালবাসতেন। রাসূল (সাঃ) এর ভালবাসায় মুগ্ধ হয়েই মরু আরবের উগ্র মানুষগুলো তাঁকে ছোটবেলাতেই আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার সময় বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। এটা তাঁর দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। আজ আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই বলেই মানুষে মানুষে এত দ্বন্দ্ব, হানাহানি, মারামারি আর খুনখারাবি।

    লেখক- পুবালী বাটাস

    উত্তরমুছুন