নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক কবি। রবীন্দ্রনাথ যেটা পারেননি, নজরুল সেটা পেরেছিলেন। সেই পারার জায়গাটাই ছিলো অসাম্প্রদায়িক মনভাব। নজরুরই লিখতে পেরেছিলেন, ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’। এক জীবনে নজরুল বিবিধ প্রতিভার স্ফূরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেবল কবি নয়, তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার, পত্রিকার সম্পাদক, যোদ্ধা, চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা আরও আরও অনেক কিছু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মূলত: শুরু হয় নজরুলের সাহিত্য এবং সাংবাদিক জীবন। ১৯২১ সালে তিনি রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’।
ভূলোক দ্যূলোক গোলক ভেদিয়া,/খোদার আসন “আরশ” ছেদিয়া/উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রির!
১৯২১ সালের ১৯ জুন দৌলতপুর থেকে ফিরে নজরুল ১৭ দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এই সময়ে অসহযোগ আন্দোলনে কুমিল্লা উদ্বেলিত ছিল। নজরুল অসহযোগ আন্দোলনের শোভাযাত্রা ও প্রতিবাদ সভায় সদ্য রচিত ও সুরারোপিত স্বদেশী গান গেয়েছিলেন-
এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো/বন্দীনী ‘মা’র আঙিনায়
১৯২২ সালের ১ মার্চ প্রকাশিত হয় তার গল্প-সংকলন- ব্যথার দান, কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা এবং একই সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত হয় প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী। অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। প্রলয় উল্লাস, আগমনী, বিদ্রোহী, কামাল পাশা প্রভৃতি কবিতা নিয়ে অগ্নিবীণা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিতার পালা বদলে যে ভূমিকা রাখে, রবীন্দ্রনাথের বলাকা এবং পুনশ্চঃ ছাড়া অন্য কোনো কবির কাব্যগ্রন্থ তা পারেনি।
১৯২০ সালের মে মাসে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অর্থানুকূল্যে নজরুল ও মুজফ্ফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায় ‘নবযুগ’ নামে একটি সান্ধ্য দৈনিক প্রকাশিত হয়। এই বছরের শেষদিকে নজরুল ‘নবযুগ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুলের সম্পাদনায় অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয়। নভেম্বর মাসে নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ও অন্য একটি রচনার জন্যে ‘ধূমকেতু’ অফিস তল্লাশি, নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয়। ১৯২৩ সালে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও প্রদান করা হয়।
১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নজরুল সাপ্তাহিক ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট ‘লাঙল’ পত্রিকা ‘গণবাণী’ নামে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে এ. কে. ফজলুল হকের উদ্যোগে পুনঃপ্রকাশিত ‘নবযুগ’-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে নজরুল পুনরায় দেন।
অসহযোগ এবং খেলাফত আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী সংগ্রামে ভারতের হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায় মহাত্মা গান্ধী ও অলি ভ্রাতৃত্বদ্বয়ের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করে। হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম নজরুলকে সে সময় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফিরে নজরুল সেই অনুপ্রেরণায় ভাঙার গান কাবতাটি রচনা করেন-
কারার ঐ লোহ-কবাট/ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট/রক্ত-জমাট/শিকল-পুজোর; পাষাণ-বেদী ….
১৯২২ সালে তার ‘যুগবাণী’ নিষিদ্ধ করা হয়। এর এক বছরের মধ্যেই ‘বিষের বাঁশি’ ও ‘ভাঙার গান’ কবিতার বই নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর নজরুলকে কুমিল্লায় গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হয়। বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ সালে ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিট্রেট সুইনহোর আদালতে যে জবানবন্দি দেন তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্য মর্যাদায় বিশেষভাবে অভিষিক্ত।
সমকালীন শ্রেষ্ঠ ও আধুনিক পত্রিকা ‘বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘নওরোজ’, ‘কল্লোল’, ‘মোয়াজ্জিন’, ‘জয়তী’, ‘নারায়ণ’, ‘বিজলী’ প্রভৃতিতে নজরুলের কবিতা ও অন্যান্য লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘ইসলাম দর্শন’, ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুলকে আক্রমণ করেও লেখা প্রকাশ করা হতো। সে সময়ে নজরুল বহুল আলোচিত, বহু প্রশংসিত, বহু নিন্দিত, বহু বিতর্কিত।
২৩ বছরের শিল্পীজীবনে তিনি ২২টি কবিতাগ্রন্থ, ৩টি নাটক, ৩টি উপন্যাস, ৩টি গল্প গ্রন্থ, ২টি কিশোর-নাটিকা, ৫টি প্রবন্ধ গ্রন্থ, ১৪টি সঙ্গীত গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত গানের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ নজরুল বন্দি অবস্থায় যেসব গান রচনা করে গাওয়ার জন্য বাইরে পাঠাতেন সেসব গানের অধিকাংশই সে সময়ের কিছু ধূর্ত সঙ্গীত রচয়িতা নিজের নামে প্রকাশ করত। এ বিষয়ে নজরুলও ছিলেন উদাসীন। তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে তিনি উত্তরে বলতেন- ওরা সাগর থেকে ক’ কলস জল নেবে!
কবির সুস্থাবস্থা অর্থাৎ ১৯৪২ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৫০-এর অধিক। পরবর্তী সময় থেকে তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত আরো ৩০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং তার মৃত্যুর পর নতুন রচনা নিয়ে আরো ১১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্রের সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চলচ্চিত্রে নজরুল একাধারে পরিচালক, কাহিনীকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, সঙ্গীত পরিচালক, নেপথ্য গায়ক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন।
১৯৩৪ সালে নজরুল ম্যাডান কোম্পানীর ফ্রামজী ম্যাডান-এর ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রের পরিচালক, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এই চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে নিতাই ঘটক কাজ করেন। ফ্রামজী সাহেবের অনুরোধে নজরুল সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়ও করেন। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে তার বিব্রত বোধ হলেও তিনি গানের ক্ষেত্রে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য থাকতেন। ১৯৩৫ সালে ‘পাতালপুরী’ ছায়াছবিতে নজরুল সঙ্গীত রচনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এই চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনায় নজরুলের সহকারী হিসেবে কমল দাশগুপ্তও কাজ করেন।
১৯৩৭ সালে তিনি নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের কাহিনী এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংলাপ সমৃদ্ধ ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রে সুরারোপ ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনী অবলম্বনে ‘গোরা’ ছায়াছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ছবিটির ‘ট্রেড শো’র দিন বিশ্বভারতী বোর্ড রবীন্দ্রনাথের সুর যথাযথ আরোপ হয়নি বলে আপত্তি তোলার পরপরই নজরুল গোরা ফিল্মের কপি, একটি ছোট প্রোজেকশন মেশিন, সঙ্গে দেবদত্ত ফিল্মসের প্রোপ্রাইটর ও তার সহকারী মানু গাঙ্গুলীকে নিয়ে সরাসরি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে যান। ১৯৩৮ সালে নজরুল নিউ থিয়েটার্সের ‘বিদ্যাপতি’ চলচ্চিত্রের কাহিনী, সঙ্গীত রচনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
১৯৩৯ সালে নজরুল ‘সাপুড়ে’ ছবির কাহিনী ও সঙ্গীত রচনা করেন। এ ছাড়া ‘নন্দিনী’ (১৯৪১), ‘অভিনয় নয়’ (১৯৪৫) ছায়াছবির সঙ্গীত রচনা ও পরিচালনাসহ দিকশূল (১৯৪৩), ‘দিলরুবা’, ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নজরুল ১৯৩১ সালে ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্রটি নিজে পরিচালনা করেন। ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্রে তিনি ‘বিষ্ণু’র ভূমিকায় অভিনয়ও করেন।
নজরুল তার বর্ণিল সাহিত্যজীবনে বহু সভা-সমিতিতে ভাষণ দেন। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম ‘বুলবুল সোসাইটি’র পক্ষ থেকে তাকে দেয়া মানপত্রের জবাবে বক্তৃতা প্রদান, ‘চট্টগ্রাম এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতায় এ্যালবার্ট হলে কবিকে দেওয়া সংবর্ধনার উত্তরে তার ‘প্রতিভাষণ’ ইতিহাসেরই একটি অংশ হয়ে আছে।
১৯৩২ সালের ৫-৬ নভেম্বরে সিরাজগঞ্জের নাট্যভবনে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনের সভাপতিরূপে ‘অভিভাষণ’, ১৯৩৬ সালে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে সভাপতি হিসেবে ভাষণ, একই বছর ডিসেম্বরে ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খানের মৃত্যু উপলে আয়োজিত শোকসভায় ‘অভিভাষণ’, ১৯৪০ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র ঈদ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ, ১৯৪০ সালে কলকাতায় ‘শিরাজী পাবলিক লাইব্রেরী ও ফ্রি রিডিং রুম’-এর দ্বার উন্মোচন উপলক্ষে সভাপতির ভাষণ, একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে বক্তৃতা, ১৯৪১ সালের ১৬ মার্চ বনগাঁ সাহিত্যসভার চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণসহ ১৯৪০ সালের ৫ ও ৬ এপ্রিল কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজতজয়ন্তি উৎসবে সভাপতি হিসেবে জীবনের শেষ ভাষণ প্রদান করেন।
নজরুল তার অল্পদিনের সুস্থাবস্থার মধ্যে সমকালীন অসংখ্য উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, এ. কে. ফজলুল হক, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, ইব্রাহিম খাঁ, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, ওস্তাদ জমীরুদ্দীন খান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, মুজফ্ফর আহমদ, আফজালুল হক, নলিনীকান্ত সরকার, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, হাবীবুল্লাহ বাহার, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন, মুরলীধর বসু, কাজী মোতাহার হোসেন, দিলীপকুমার রায়, প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, সবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। স্নেহভাজন হিসেবে আব্দুল কাদির, জসীম উদ্দীন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, মাহফুজুর রহমান খান, বেনজীর আহমদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, সুফী জুলফিকার হায়দার, ব্রজবিহারী বর্মণ, প্রতিভা বসু (রানু সোম), কাননবালা, আঙুরবালা, ইন্দুবালা প্রমুখের সান্নিধ্য বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
যতদিন সুস্থ ছিলেন একের পর একে আত্মিক রণে মুমূর্ষু হয়েছেন নজরুল। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। জাগ্রত বিবেকের আহ্বানে জেগে উঠেছেন বারবার। বিদ্রোহ করেছেন শোষিত মানুষের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। লন্ডনের অফিস লাইব্রেরী এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত নিষিদ্ধ বইয়ের মধ্যে নজরুলের বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, যুগবাণী ও চন্দ্রবিন্দু অন্যতম। সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে নজরুল নিষিদ্ধ হলেও নজরুল মানুষের হৃদয়ের প্রবেশদ্বারে উন্মুক্ত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন