পশ্চিমা সভ্যতা
পাশ্চাত্য ভাল করেই জানে যদি বিশ্বব্যাপী তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে হয় এবং গোটা বিশ্বকে ভোগবাদী ও বস্তুবাদীকরণ করতে হয়, তাহলে তাদের জীবনদর্শন ও জীবনাদর্শকে অনুসরণীয় বানাতে হবে। এই ফাঁদ পেতে মানুষের বিবেককে স্বীয় প্রভাববলয়ে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের চিন্তা-ধারা ও ধ্যান ধারণার ওপরই প্রথম হামলা চালাতে হবে। তাই তারা তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে গোটা বিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দিকে মনোনিবেশ করল। বর্তমানে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ভয়াবহ আগ্রাসন চলছে। এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে ইসলামী বিশ্ব শুধু বস্তুগত ও মানবিক দিক দিয়েই চরম ক্ষতিগ্রস্ত নয়; বরং তাদেরকে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও আকীদা-বিশ্বাস থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের নিজস্ব সভ্যতা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আকীদা বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত বানিয়ে দিচ্ছে। অপরদিকে সভ্যতা-সংস্কৃতির বৈচিত্র এবং স্বাতন্ত্র্য নির্মূল করে একটি আন্তর্জাতিক সভ্যতা তথা মার্কিন সভ্যতাকে গোটা মানব সমাজের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে শুধু মুসলিম উম্মাহই নয়; বরং প্রতিটি দেশ ও জাতিগোষ্ঠী তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাচ্যের জাতি-গোষ্ঠীকে নগ্নতা অশ্লীলতার পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যাতে তারাও পশ্চিমা পাশ্চাত্যের মানসিক গোলামী
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, পাশ্চাত্যের এই সুদীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার ফলে বর্তমানে কোনো মুসলিম জনপদই সত্যিকারভাবে রাজনৈতিক ও মানসিক দিক দিয়ে পুরোপুরি স্বাধীন নয় কোথাও তারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভোগ করলেও নৈতিক ও মানসিক গোলামি থেকে আদৌ মুক্ত নয়। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, হাট বাজার, সভা সমিতি, ঘরবাড়ি, এমনকি তাদের আপন দেহ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা সংস্কৃতি, চিন্তাধারা ও জ্ঞান বিজ্ঞান তাদের ওপর পুরোমাত্রায় কর্তৃত্বশীল। তারা পাশ্চাত্যের মগজ দিয়ে চিন্তা করে, পাশ্চাত্যের চোখ দিয়ে দেখে, পাশ্চাত্যের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে চলে। তারা উপলব্ধি করুক আর নাই করুক তাদের মগজের ওপর এই ধারণাই চেপে রয়েছে যে, পাশ্চাত্য যাকে সত্য মনে করে, তাই সত্য, আর সে যাকে মিথ্যা ঘোষণা করছে, তাই মিথ্যা। তাদের মতে-সত্যতা, যথার্থতা, সভ্যতা, নৈতিকতা, ভদ্রতা, শালীনতা ইত্যাদির ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নির্ধারিত মানদন্ডই হচ্ছে একমাত্র নির্ভুল মানদন্ড। এমনকি নিজেদের দ্বীন ও ঈমান, চিন্তাধারা ও ধ্যান ধারণা, সভ্যতা ও শালীনতা, চরিত্র ও রীতিনীতি, সব কিছুই তারা ওই মানদন্ডে যাচাই করে। যে জিনিস এই মানদন্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ, তাকেই তারা যথার্থ বলে মনে করে, তার সম্পর্কে তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে যায় এবং জিনিসটি পাশ্চাত্য মানদন্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে গর্ববোধ করে। আর যা কিছু এই মানদন্ডের বিচারে উত্তীর্ণ নয়, তাকে তারা সচেতনভাবে হোক কি অচেতনভাবে ভ্রান্ত বলে মনে করে। কেউ তাকে প্রকাশ্যে বর্জন করে, কেউ মনে বিরক্তি বোধ করে এবং কোনো রকম টেনে হিঁচড়ে তাকে পাশ্চাত্য মানদন্ডে উতরিয়ে নেবার চেষ্টা করে।
আমাদের স্বাধীন জাতিগুলোর অবস্থাই যখন এই তখন পাশ্চাত্য জাতিগুলোর অধীনস্থ মুসলমানদের মানসিক গোলামীর কথা আলোচনা করে আর কি লাভ?
প্রতিরোধের কর্মপন্থা
নবতর ঈমানের প্রশিক্ষণ
পাশ্চাত্যের এই সর্বগ্রাসী বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা থেকে রক্ষা পেতে হলে সর্বপ্রথম মুসলিম বিশ্বকে ইসলামের ওপর নবতর ও জীবন্ত ঈমান আনতে হবে। মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন ধর্ম, নতুন জীবন দর্শন, নতুন পয়গম্বর, নতুন শরীয়ত ও নতুন তালীম বা শিক্ষামালার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। ইসলাম চির শাশ্বত। সে তো সূর্যের মতো, না কখনো পুরানো ছিল আর না সে এখনো পুরানোরাসূলের নবুওয়াত চিরস্থায়ী ও আখেরী নবুওয়াত। তার আনীত দ্বীন সুরক্ষিত এবং তার প্রদত্ত শিক্ষামালাও জীবিত ও জীবন্ত। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই, মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন ঈমানের আবশ্যক। নতুন ফিতনা, নতুন শক্তি, নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণা এবং নতুন আহবান মোকাবিলা কমজোর ঈমান ও কেবল রসম রেওয়াজ ও আচার অভ্যাস দিয়ে করা যাবে না। কোনো জরাজীর্ণ ও দশাপ্রাপ্ত প্রাসাদ নতুন সাইক্লোন ও নতুন কোনো প্লাবনে ধাক্কা সইতে পারে না। তাই মুসলিম বিশ্ব যদি মনুষ্য জগতে নবতর রূহ ও নতুন জীবন সৃষ্টি করতে চায় এবং দুনিয়ার বর্তমানের বস্তুবাদিতা এবং সন্দেহ-সংশয় ও অস্থিরতার ওপর জয়লাভ করতে চায় তাহলে তাকে তার ভেতর নতুন ঈমানী শক্তি, জীবন্ত ইয়াকীন ও নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে হবে।
চেতনাবোধের প্রশিক্ষণ
কোনো জাতির জন্য সর্বাধিক বিপজ্জনক বিষয় হলো, সে জাতি সঠিক জ্ঞানবুদ্ধি ও চেতনাবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের চেতনাবোধ তৈরি হবে এবং দৃষ্টি যতদিন না পরিণত ও পাকাপোক্ত হবে ততদিন এই বিপদাশংকা থেকেই যায় যে, তারা অন্য কোনো আহবান বা আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত হবে এবং দেখতে না দেখতেই শত শত বছরের শ্রম ও সাধনাকে ব্যর্থ ও নিষ্ফল করে দেবে। সাইয়েদ আবুর হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, এ সময়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, মুসলিম জাতির বিভিন্ন শ্রেণী ও জনগণের মধ্যে সঠিক চেতনাবোধ জাগ্রত করা, এমন চেতনা যা কোনো রকমের জুলুম ও বেইনসাফী বরদাশত করে না, ধর্ম ও নৈতিকতার বিকৃতি সহ্য করে না, যা সহীহ শুদ্ধ ও ভুলভ্রান্তি, অকপটতা ও কপটতা, দোস্ত-দুশমন তথা শত্রু-মিত্র, শান্তিকামী ও অশান্তি সৃষ্টিকারীর মধ্যে খুব সহজেই পৃথক করতে হবে। অপরাধী ও অন্যায়কারী যেন তার অসন্তোষ ও ক্রোধের হাত থেকে বাঁচতে না পারে এবং অকপট ও নিষ্ঠাবান মানুষ যেন তার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যা সংকট ও বিষয়াদির ক্ষেত্রে একজন বুদ্ধিমান ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারে এবং ফয়সালা করার সামর্থ্য রাখে। যতদিন এই চেতনাবোধের উন্মেষ না ঘটবে, কোনো মুসলিম দেশ ও জাতির কর্মপ্রেরণা, কাজের সামর্থ্য ও যোগ্যতা, ধর্মীয় আবেগ ও মাযহাবী জীবনের প্রদর্শনী ও দৃশ্যাবলী খুব বেশি একটা গুরুত্ব বহন করে না।
নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা
মুসলিম বিশ্বের জন্য জরুরি হলো, শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে নতুন করে ঢেলে সাজানো যা হবে তার রূহ ও তার পয়গামের সঙ্গে সঙ্গতিশীল। মুসলিম বিশ্ব প্রাচীন পৃথিবীর ওপর তার জ্ঞানগত নেতৃত্ব কায়েম করেছিল এবং দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতা সংস্কৃতির অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছিল। সে দুনিয়ার সাহিত্য ও দর্শনের হৃৎপিন্ডে তার বাসা বানিয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী সভ্য দুনিয়া তার বুদ্ধি নিয়ে চিন্তা করেছে, তার কলম দিয়ে লিখেছে এবং তারই ভাষায় লেখালেখি করেছে, গ্রন্থ প্রণয়ন করেছে। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী হযরত আদম (আ.) কে ভূ-পৃষ্ঠের খেলাফত প্রদান করা হয়েছিল সৃষ্টি সম্পর্কীয় জ্ঞানের কারণেই। সুতরাং দ্বীনি ও গতিক দুধরনের জ্ঞান জীবন নামক গাড়ির দুটি চাকার ন্যায় যে কোনো একটি চাকা বিকল হয়ে গেলে গাড়িটি আর সামনে অগ্রসর হতে পারে না। তদ্রূপ মানুষ যদি দ্বীনি জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায় তাহলে মানুষ ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবে, আর যদি জাগতিক জ্ঞান থেকে দূরে সরে যায় তাহলে পৃথিবীর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। নবুওয়তের যুগ থেকে নিয়ে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে সার্বজনীন ইসলামী একক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যেমনিভাবে হাফেজ, আলেম, মুফতী, ইমাম ও খতীব বের হয়েছেন তেমনিভাবে ইতিহাসবিদ, ভুগোলবিদ, রসায়নবিদ, গণিতবিদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, শাসক ও সেনাবাহিনীও বের হয়েছেন। অতএব মুসলিম উম্মাহকে আবার তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে হলে তাকে অবশ্যই গণমুখী উৎপাদনমুখী সার্বজনীন ইসলামী একক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।
জ্ঞান-গবেষণা ও লেখার ময়দানে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন
মুসলিম সমাজে এমন চিন্তাবিদ ও তথ্যানুসন্ধানীর আবির্ভাব হতে হবে, যারা চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-গবেষণা ও লেখার ময়দানে আত্মনির্ভরশীল হবেন এবং এর সাহায্যে পাশ্চাত্য সভ্যতার গোটা ভিত্তিমূলকেই ধসিয়ে দিতে সক্ষম হবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, ইসলামী বিশ্বকে চিন্তা চেতনা, জ্ঞান গবেষণা ও লেখার ময়দানে আত্মনির্ভরশীল এবং ওরিয়েন্টালিস্টদের ইলমী গবেষণার বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। তিনি বলেন, ওরিয়েন্টালিস্টদের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়ার নির্মূল ও তাদের বিশাল ত্রুটির সংশোধনের জন্য ওলামালে ইসলাম, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও মুসলিম রিসার্চ স্কলারদের দায়িত্ব হলো- ইলমী বিষয়ে গবেষণাসমৃদ্ধ প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী রচনা করা এবং ইসলামী বিশ্বকে সঠিক নির্ভরযোগ্য জ্ঞান-গবেষণা ও ইসলামের নির্ভেজাল সঠিক পরিকল্পনা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করানো-ওইসব সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে, যেগুলো ওরিয়েন্টালিস্টদের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য, বরং ইলমী পদ্ধতি, গবেষণার নীতিমালা, গভীর বিশ্লেষণ, সুগভীর দৃষ্টি, ব্যাপক অধ্যয়ন, নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স, তথ্যসূত্র ও শক্তিশালী দলিল প্রমাণের ক্ষেত্রে তাদের থেকেও অগ্রগামী হওয়া এবং ওইসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ইলমী দুর্বলতাগুলো থেকেও নিরাপদ থাকা, যেসব ক্ষেত্রে সাধারণত ওরিয়েন্টালিস্টরা পদস্খলনের শিকার হয়েছে। এই কাজটির গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে আল্লামা নদভী লেখেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এ কাজটি আঞ্জাম না দেয়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বের আধুনিক শিক্ষিত মেধাবী সাহসী যুব সমাজ, যারা ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখাপড়া করছে কিংবা নিজ দেশে ইউরোপিয়ান ভাষায় ইসলাম নিয়ে অধ্যয়নে অভ্যস্ত, তাদেরকে ওরিয়েন্টালিস্টদের বিষাক্ত চিন্তাধারা ও তাদের মনস্তাত্ত্বিক গোলামী থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।
শক্তিশালী সাহিত্য রচনা করা
এ যুগ ভাষা সাহিত্যের যুগ। ভাষা সাহিত্যের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা মুসলিম বিশ্বে প্রসার লাভ করেছে। তাই মুসলিম উম্মাহকে ভাষা সাহিত্যের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিতে হবে। আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, ভাষা ও সাহিত্যকে ইসলামবিরোধী শক্তির রহমকরমের ওপর ছেড়ে দেবেন না। ওরা লিখবে আর আপনারা পড়বেন ওই অবস্থা কিছুতেই বরদাশত করা উচিত নয়। দুটি শক্তির হাত থেকে ভাষা সাহিত্যের নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে হবে। অমুসলিম শক্তির হাত থেকে এবং অনৈসলামী শক্তির হাত থেকে। অনৈসলামী শক্তি বলতে সেই সব নামধারী মুসলিম লেখক সাহিত্যিকদের কথাই আমি বোঝাতে চাচ্ছি যাদের মন-মগজ ও চিন্তা-কর্ম ইসলামী নয়। মোট কথা এই উভয় শক্তির হাত থেকেই ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব ছিনিয়ে আনতে হবে। এমন অনবদ্য সাহিত্য গড়ে তুলতে হবে যেন অন্য কেউ আর ফিরেও না তাকায়।
তথ্য-প্রযুক্তি ও মিডিয়ার শক্তি অর্জন করা
শত্রু যে পদ্ধতিতে অগ্রসর হবে তার জবাব সে পদ্ধতিতে দেয়াই যুক্তিযুক্ত। শত্রু আজ মিডিয়া ও তথ্য-প্রযুক্তির ছিদ্র পথ দিয়ে দিন দুপুরে আমাদের ঈমান আকীদার ওপর হামলা চালাচ্ছে। সেই হিসেবে তার জবাবও সেই তথ্য-প্রযুক্তি ও মিডিয়ার পথ ধরেই দিতে হবে। সে লক্ষ্যে আমাদেরকে শক্তিশালী ও কার্যকর ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়া গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রচলিত ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ায় আমাদের লোকজনদের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এমনিভাবে ইসলামের ধারক-বাহকদের আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিতে শক্তি অর্জন করতে হবে এবং সেগুলো ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন বাদ মতবাদের অসারতা প্রমাণ করা
ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন মোকাবেলায় একদল যোগ্য মেধাবী কর্মীবাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাদেরকে লেখনী, জ্ঞান গবেষণা, চিন্তা চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধশালী হিসেবে করে গড়ে তুলতে হবে, যারা ইসলামী বিশ্ব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যান ধারণা, চিন্তাধারা, পাশ্চাত্যের জীবনব্যবস্থা, নীতি আদর্শ, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতিসহ সমকালীন সকল ইসলাম বিরোধী বাদ মতবাদ নিয়ে গবেষণা করবেন এবং তাতে ব্যুৎপত্তি হাসিল করে এগুলোর অসারতা প্রমাণ করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবেন।
শিশুদের নিাপ সাদাসিধে মন ফলকের ওপর কালিমা লেপে দেয়া হয়। এসব কার্টুন ও মুভিতে সাধারণত দাঁড়ি বিশিষ্ট মানুষদের শয়তান ও ভূত দৈত্য বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এভাবেই জীবনের সূচনাতে শিশুদের কচিকাঁচা কোমল মনে ইসলাম বিরোধী পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে জীবন বাড়ার সাথে সাথে দ্বীন ও ধর্মের প্রতি তারা ক্রমশঃ বীতশ্রদ্ধ হতে থাকে।
বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামের বিরুদ্ধে যে বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা চলছে তার এক সর্বগ্রাসী ফলাফল আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে-
ব্যাপক দ্বীনি, নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন
পাশ্চাত্যের বহুমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ফলে মানুষের মাঝ থেকে নীতি-নৈতিকতা ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ বিদায় হয়ে গেছে। সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয মহল আজ ভোগবাদী মানসিকতা ও পার্থিব আরাম-আয়েশের পিছনে হন্যে হয়ে ছুটছে। অন্য কথায়, দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা, পার্থিব জীবনের প্রতি মোহ এবং ভোগবাদী চিন্তা-চেতনা মহামারী আকারে প্রসার ঘটেছে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো, মানবী বৈশিষ্ট্যাবলী ও নৈতিকতার অবক্ষয়, ইসলাম কর্তৃক হারাম বিষয়কে হালকাভাবে গ্রহণ, অশ্লীলতার প্রসার, মদ্যপ সমাজের সৃষ্টি এবং ইসলামের ফরজ, ও আবশ্যকীয় বিষয় থেকে এমন বাধা বন্ধনহীন স্বাধীনতা, যেন এই শ্রেণীর কাজের সাথে ইসলামের কোনোই সম্পর্ক নেই কিংবা ইসলামী শরীয়ত অতীত কোনো দাস্তান ও বিয়োগান্ত উপাখ্যান ছিল, আজ তা মানসুখও হয়ে গেছে। ইসলামী দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে আজ এ ভোগবাদী মানসিকতা লালনকারী এক বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আমাদের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।
ধর্মহীনতার উত্তাল সয়লাব
এই সুদীর্ঘ সময় ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার ফলে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক মানসিক ধর্মান্তর ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ নিজের অবচেতনভাবেই ধর্মহীন হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম নাম ধারণ করলেও তাদের মধ্যে ধর্মের ন্যূনতম মূল্যবোধটুকুও পাওয়া যায় না। এই ধর্মহীনতার সয়লাব আজ মুসলিম বিশ্বের সীমান্তের বহু ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আমাদের কিল্লায় নয়, বরং আমাদের কলিজায় আঘাত করেছে। পূর্ণ এক শতাব্দী হতে চলেছে ইউরোপ আমাদের যুবক ও শিক্ষিত শ্রেণীর মস্তিষ্ক বিকৃত করে আসছে। সংশয়,
সন্দেহ, ধর্মহীনতা, নাস্তিকতা, ভন্ডামী ও প্রতারণার বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছে তাদের হৃদয়ে, চিন্তা-চেতনায়। এতে ধর্মীয় সকল বিষয়ে তাদের ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, বরং সেখানে স্থান করে নিয়েছে বস্তুতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যান ধারণা। নতুন শতাব্দীর এ ঊষালগ্নে আজ আমরা এক ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর ঈমান ও বিশ্বাস আজ নড়বড়ে, ঘুন ধরা। এমন এক প্রজন্ম আমাদের শাসন ক্ষমতায় আসছে যাদের না ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ওপর ঈমান আছে, না তাদের মধ্যে ইসলামপ্রীতি, ইসলামী চেতনাবোধ এবং সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসনকে প্রাধান্য দেয়ার উৎাসহ-উদ্দীপনা আছে, না তার মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে জাতিগতভাবে সেও গণনায় মুসলমান এই সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক আছে। আর যদি কিছু সম্পর্ক থাকেও তা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য। ব্যস, এছাড়া আর কোনো সম্পর্ক নেই। এখনকার অবস্থা তো এর চেয়েও নাজুক। ধর্মবিবর্জিত মানসিকতা, অধর্মীয় চিন্তাধারা, বিজাতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনীতিপ্রীতি আমাদের সাধারণ জনগণ ও গ্রামীণ জীবন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আজ মুসলমানদের মাথার ওপর ব্যাপক ধর্মহীনতার নাঙ্গা কৃপাণ ঝুলছে।
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০১০
ইসলামের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা প্রতিরোধের কর্মপন্থা -শহীদুল ইসলাম ফারুকী
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন