মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০১০

বন্দি নির্যাতনের নতুন কৌশল

বন্দি নির্যাতনের নতুন কৌশল আবিষ্কার করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই কৌশল হিসেবে বন্দিদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে চালান দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। জেল কোড অমান্য করে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি (কয়েদি) কিংবা হাজতিদের এক জেল থেকে অন্য জেলে চালান দিয়ে চালানো হচ্ছে এই নির্যাতন। এছাড়া বন্দিদের অযৌক্তিকভাবে রিমান্ডে নেয়া, বিভিন্ন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো, গ্রেফতার থাকা অবস্থায় একের পর এক মামলা দেয়া এবং আদালতে হাজির করার প্রয়োজন নেই এমন সব মামলায় দফায় দফায় আদালতে হাজির করা—বন্দি নির্যাতনের নতুন কৌশল হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে। আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীসহ বিশিষ্টজনরা বিষয়গুলোকে সাংবিধানিক, নাগরিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন।
জেল কোডে বলা রয়েছে, আসামিদের কোর্টের নিকটস্থ কারাগারে রাখতে হবে। নিরাপত্তার জন্য জনসমাগম এবং হাটবাজার রয়েছে এমন রাস্তা এড়িয়ে সহজ রাস্তায় কোর্টে আনা-নেয়া করতে হবে। অথচ কারা কর্তৃপক্ষ জেল কোড লঙ্ঘন করে চলেছে। সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে গ্রেফতারের পর এ পর্যন্ত ১৫ বার এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে চালান করা হয়েছে। তার মামলাগুলোর প্রায় সবকটিই চাঁদপুর জেলায়। জেল কোড অনুযায়ী ওই জেলার কারাগারেই তাকে রাখার কথা। তা না করে মিলনকে চালান করা হয়েছে কুমিল্লা, রংপুর, ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন কারাগারে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে শুধু চালান করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে চরম অসুস্থ অবস্থায় ১০ দফায় ৬৭ দিন রিমান্ডে রাখা হয়েছে। রিমান্ডে নেয়ার পর নাক দিয়ে তাজা রক্ত বের হয়ে তার জামাকাপড় ভিজে যায়। সে অবস্থায় আবার রিমান্ডে দেয়া হয়েছে বাবরকে। দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চালান করা হয়েছে কাশিমপুর কারাগারে। আনা-নেয়ার নামে তার ওপর চরম মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার কোর্ট-কাচারিতে আনা-নেয়ার সময় দুঃসহ যানজট ও গরমের মধ্যে ৭/৮ ঘণ্টা তাকে অমানবিক কষ্ট সইতে হচ্ছে।
শুধু চালানই নয়, রিমান্ডসংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অসুস্থ অবস্থায় বন্দিদের দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। গ্রেফতারের পর দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। ওইসব মামলায় আবার রিমান্ডেও নেয়া হচ্ছে। এজাহারে অজ্ঞাত আসামির মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে গ্রেফতারকৃত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদেরও।
সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়া বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস আমার দেশকে বলেন, গ্রেফতার হওয়ার পর জামিন পেয়েও আমি মুক্তি পাইনি। মুক্তির জন্য জেলগেটে এসে আবার শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেফতারের মধ্যে পড়েছি। তিনি বলেন, আমাদের জন্য গ্রেফতার হওয়াটাই একটি অস্বাভাবিক বিষয়। এটা মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক যন্ত্রণার বড় কারণ। আমি গ্রেফতার হওয়ার পর চরম অসুস্থ হয়ে পড়ি। জেলের নরক যন্ত্রণা তো আছেই, গ্রেফতার হওয়ার ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানসিক, শারীরিক সব দিক থেকেই আমি ও আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে পরিবারের শিশুসন্তানরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার গ্রেফতারের ছবি টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় দেখে আমার সন্তানরা বন্ধু-বান্ধবদের কাছে স্কুল-কলেজে হেয় হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তাকে আটকের পর ৬টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আসামি অজ্ঞাত এমনসব সংবেদনশীল মামলাতেও শ্যোন অ্যারেস্ট করা হয়েছিল মির্জা আব্বাসকে।
মির্জা আব্বাসের মতো একই তথ্য জানালেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবি। তিনি বলেন, জামিন ও হাজিরার জন্য সারাদিন কোর্টের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে হয়। একের পর এক মামলা ও জেলে জেলে চালানের কারণে পুরো পরিবার এখন বিপর্যস্ত। গ্রেফতারের আগে মিলনের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা দেয়া হলেও গ্রেফতারের পর দেয়া হয়েছে আরও ১৫টি সাজানো মামলা। তিনি আরও বলেন, তিনি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছেন তার একমাত্র শিশুকন্যা তানজীদাকে নিয়ে। তার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল বাবা। সেই বাবা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে সে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে মনমরা অবস্থায় দিনরাত কান্নাকাটি করেই কাটছে তার সময়। কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা হলেই অঝোরে কাঁদে মিলনের শিশুকন্যা তানজীদা। নাজমুন আরা বেবি বলেন, বাবাকে কাছে না পাওয়ার শোকে কাতর এই মেয়েকে নিয়ে তিনি কী করবেন, কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। মির্জা আব্বাস কিংবা এহছানুল হক মিলনের মতোই অবস্থা গ্রেফতার হওয়া মানুষের প্রতিটি পরিবারের।
রিমান্ড এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের বিষয়ে দীর্ঘদিন থেকেই সোচ্চার মানবাধিকার কর্মীরা। হাইকোর্ট বিভাগও রিমান্ডে নেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো মানা হচ্ছে না, যা নিয়ে খোদ আদালতও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গত বছর অক্টোবরে জামিন আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে রিমান্ডে নেয়ায় ক্ষুব্ধ হন হাইকোর্ট। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম জহিরুল হককে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করে হাইকোর্ট বলেন, ‘শুনানিতে সময় নেবেন আবার রিমান্ডে নিয়ে টর্চার করবেন—এটা কোন ধরনের আচরণ? মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমরা এখানে বসেছি। আপনি আজ রাষ্ট্রপক্ষে আছেন। কাল অন্যপক্ষেও থাকতে পারেন। আপনাকেও টর্চার করা হতে পারে। এটা ভালো নয়। আপনাদের ক্ষমতা আছে, আমাদেরও পেটান। এভাবে চালাতে চাইলে হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন।’ এতকিছুর পরও রিমান্ড ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।
জেলে জেলে চালান, রিমান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট করা, একের পর এক মামলা দেয়ার ঘটনাও চলছে সারাদেশে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তিকেই এসব মামলায় বেশি হয়রানি করা হচ্ছে। মামলা, রিমান্ড ও নির্যাতনের ভয়ে সারাদেশে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী এখন ঘরছাড়া। অনেকে জামিনও পাচ্ছেন না। এসব নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সোচ্চার দেশের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জেল কোড না মেনে দূরবর্তী কারাগারে চালানের নামে আসামির প্রতি নির্যাতন অবশ্যই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আগে এগুলো দেখার জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। সরকার যেহেতু একটি সত্ উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম দিয়েছে, এর থেকে ভালো কিছু আশা করা উচিত। তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব বিষয় গভীর পর্যবেক্ষণ করছেন।’ রিমান্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে রিমান্ডে নেয়ার অর্থই দাঁড়ায় নির্যাতনের মাধ্যমে তথ্য আদায় করা, যা অনেক ক্ষেত্রেই আইনসম্মতভাবে হয় না। সঙ্গত কারণে আদালতের আইনজীবী ও বিচারকদের মানসিকতাকে আরও উন্নত ও সচেতন করতে হবে। আইনবিজ্ঞান অনুসরণ করে আসামিদের রিমান্ডে দিতে হবে। আশার কথা হলো মানবাধিকার কর্মীদের জোরাল আপত্তি ও প্রতিবাদের মুখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। অবস্থার উন্নতিতে হয়তো একটু সময় লাগবে।’
একের পর এক মামলা দেয়া, শ্যোন অ্যারেস্ট করা ও রিমান্ডে নেয়া প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও প্রখ্যাত আইনজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, মামলা দিয়ে রাজনৈতিক ও পুলিশি হয়রানিতে নিরীহ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় মামলার এজহারে আসামি ‘অজ্ঞাত’ রেখে মামলা রেকর্ড হচ্ছে। এর থেকে সরকার ও সরকারি দল রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে। তার ওপর নতুন করে যোগ হয়েছে জেলে জেলে চালান। কোনো সভ্য সমাজে এরকম নজির নেই। এসব মানুষ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে প্রতিকারের জন্য আসেন। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত তাদের জামিন না দিয়ে নিম্নআদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। হয়রানিমূলক মামলায় জামিন বিবেচনা না করলে আদালতের প্রতিও দেশের মানুষের আস্থা নষ্ট হবে বলে এই আইনজীবী মত দেন।
সিনিয়র আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সানাহউল্লাহ মিয়া বলেন, জেল কোড অমান্য করে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার জন্যই এক জেল থেকে অন্য জেলে চালান করা হচ্ছে। সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে কারা কর্তৃপক্ষ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের টর্চার করার জন্যই চালানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এহসানুল হক মিলনকে রংপুর কিংবা সিলেট কারাগারে, মাহমুদুর রহমানকে কাশিমপুর কারাগারে চালান কোনো যুক্তিতেই পড়ে না। তারপরও সেখানে চালান করা হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতন করার জন্য। লুত্ফুজ্জামান বাবরকে নাক দিয়ে টপ টপ করে রক্তপড়া অবস্থায় রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আইনে বলা আছে, আগে সুস্থ করে তারপর জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। তা না করে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য এটা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এভাবে চালান, রিমান্ডে নেয়া, এজাহারে অজ্ঞাত আসামির মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট করা, একের পর এক মামলা দেয়া যে কোনো নাগরিকের সাংবিধানিক, নাগরিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন